Sunday, August 16, 2015

ডিপ্লোমা বনাম বিএসসি- মুখোমুখি অবস্থানে ইঞ্জিনিয়াররা!

বিভাষ বাড়ৈ ॥ চরম বৈষম্য আর সঙ্কট কবলিত
দেশের পলিটেকনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের
শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও ডিপ্লোমা
ইঞ্জিনিয়ারদের প্রাপ্য অধিকার ও যৌক্তিক
দাবি পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বিএসসি
ইঞ্জিনিয়াররা? যুগের পর যুগ ধরে পলিটেকনিক
ইনস্টিটিউট থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের
‘ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার’ বলা হলেও হঠাৎ আজ
কেন ওই শব্দ নিয়ে ইঞ্জিনিয়ার্স
ইনস্টিটিউশন নেতাদের আপত্তি? দেশজুড়ে
আন্দোলন করা পলিটেকনিক শিক্ষার্থী,
শিক্ষক ও ডিপ্লোমাধারী পেশাজীবীদের দাবি
পূরণে সরকারের উদ্যোগের বিরুদ্ধে
ইনস্টিটিউশন নেতাদের হুমকিতে এসব প্রশ্ন
সামনে চলে এসেছে। পলিটেকনিক শিক্ষার্থীদের
দাবি পূরণ করা হলে সব প্রকৌশল
বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়ার হুমকির ঘটনায়
আবার অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।
ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন নেতাদের
তৎপরতাকে ‘ইগো প্রোবলেম’ আর ‘উদ্ভট’
চিন্তার ফল অভিহিত করে এর বিরুদ্ধে
যৌক্তিক অবস্থান নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে
পলিটেকনিক শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ ডিপ্লোমা
ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন। তাঁরা ঘটনার
তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, হঠাৎ এ তৎপরতা
দেশকে অচল করে দেয়ার পাঁয়তারা ছাড়া কিছুই
নয়। ইঞ্জিনিয়ার শব্দ কোন একক গোষ্ঠীর
জন্য পৃথিবীতে কোথাও বরাদ্দ করা হয়নি।
বিএসসি করলে ‘বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার’ আর
ডিপ্লোমা করলে ‘ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার’
পৃথিবীর সব দেশেই স্বীকৃত।
পলিটেকনিক শিক্ষক, শিক্ষার্থী তাঁদের সংগঠন
ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স
এ্যাসোসিয়েশন নেতৃবৃন্দ বলেছেন,
ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন নেতারা গায়ের
জোরে কথা বলছেন। তাঁরা কোন যুক্তির ধার
ধারছেন না। আমরা তো দাবি করিনি যে,
আমাদের ‘বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার’ বলতে হবে।
আমরা বলেছি আমাদের ‘ডিপ্লোমা
ইঞ্জিনিয়ার’ বলতে হবে। পৃথিবীর সব দেশের
মতো এদেশেও সকলে এটা জানেন। কিন্তু এখন
হঠাৎ ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন নেতাদের
বাধা সঙ্কট তৈরি করার জন্যই। এর আগে গত
২৭ সেপ্টেম্বর দাবি পূরণে সরকারের সুনির্দিষ্ট
আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে দেশব্যাপী কারিগরি
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলমান আন্দোলন ১৫
দিনের জন্য স্থগিত করেছে পলিটেকনিক
ইনস্টিটিউটের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। টানা চার
দিন ধরে বিক্ষোভ, অবরোধ ও ভাংচুরের
প্রেক্ষাপটে ওইদিন সচিবালয়ে সরকারের সঙ্গে
আন্দোলনকারীদের বৈঠকের পর কারিগরি ছাত্র
পরিষদ এ ঘোষণা দিয়েছিল। বৈঠকের সিদ্ধান্ত
অনুসারে ১৫ দিনের মধ্যে সরকার বিতর্কিত
একটি গেজেট সংশোধন করবে। চাকরিতে
প্রবেশের পরে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের
পদোন্নতি দেয়া হবে, শিক্ষার্থী বৃত্তির
পরিমাণও বাড়ানো হবে। ওইদিনই শিক্ষা
মন্ত্রণালয় ও পূর্ত মন্ত্রণালয়ের যৌথ
সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, সুপারভাইজার নয়
বরং পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে যাঁরা
ডিপ্লোমা করবেন তাঁরা প্রকৌশলী হিসেবেই
বিবেচিত হবেন। তাঁরা ডিপ্লোমা প্রকৌশলীই
হবেন। চাকরিতে প্রবেশের সময় তাঁরা উপ-
সহকারী প্রকৌশলী হিসেবেই বিবেচিত হবেন,
সুপারভাইজার নয়। অবরোধ ও ভাংচুরের
প্রেক্ষাপটে ২০০৮ সালের সেই গেজেট
সংশোধনসহ অন্য দাবি নিয়ে পূর্ত
মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় এসব
সিদ্ধান্ত নেয়। পলিটেকনিকসহ কারিগরি
প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পর্কে জানা গেছে,
কারিগরি শিক্ষাকে দক্ষ জনশক্তি তৈরির
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে অভিহিত করা
হচ্ছে বার বার। কিন্তু সবচেয়ে বেশি অবহেলা
আর সঙ্কটের মুখে পড়ে আছে এ শিক্ষাই।
কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও এর শিক্ষার্থী আর
শিক্ষাগ্রহণ শেষে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার
প্রতিটি ক্ষেত্রে কেবল উপেক্ষা আর বৈষম্য।
ভয়াবহ শিক্ষক সঙ্কট, বেতন না পাওয়ামহ
বহুমুখী অব্যবস্থাপনায় ভেঙ্গে পড়েছে খোদ
দেশের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম।
প্রতিবছর হাজার হাজার নতুন শিক্ষার্থী নিয়ে
ডাবল শিফটে শিক্ষাদান চললেও রাজস্বভুক্ত
২০ পলিটেকনিকে খালি পড়ে আছে ৬০ শতাংশ
শিক্ষকের পদ। প্রকল্পভুক্ত ২৯টিতে ৮০
শতাংশ পদে কোন শিক্ষকই নেই। অধ্যক্ষ-
উপাধ্যক্ষ নেই অধিকাংশতেই। কোন শিক্ষক
ছাড়াই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে অসংখ্য বিভাগ
যেখানে শিক্ষার্থীদের চার বছরের ডিপ্লোমা
পাসের পর নেই উচ্চ শিক্ষারও কোন সুযোগ।
অন্যদিকে বৈষম্য যেন সঙ্গী ডিপ্লোমা
ইঞ্জিনিয়ারদের। নেই স্পেশাল ইনক্রিমেন্ট।
তিন যুগেও হয়না পদোন্নতি, ডিপ্লোমা
ইঞ্জিনিয়ারদের অবমূল্যায়ন করে গেজেট
প্রকাশ হলেও সরকারী অবহেলার কারণে দীর্ঘ
ছয় বছরেও তা বাতিলের উদ্যোগ নেই। বছরের
পর বছর ধরে অবহেলার শিকার হয়েই সম্প্রতি
দেশজুড়ে আন্দোলনে নামেন শিক্ষক-
শিক্ষার্থীসহ এর সঙ্গে জড়িতরা। শিক্ষকরা
আক্ষেপ করে বলেন, এমন সঙ্কট রেখে
ডিল্পোমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো
প্রায়োগিক শিক্ষা প্রদান করা মানে হচ্ছে
শিক্ষার নামে প্রহসন। অবহেলার কারণে
যেখানে আসছে শিক্ষার্থীরাও। বর্তমানে এ
শিক্ষায় শিক্ষিতের হার মাত্র ৩ শতাংশ।
অথচ উন্নত দেশগুলোতে এ হার ৪০ থেকে ৬০
শতাংশ। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা সরকারের
কাছে দ্রুত সঙ্কট নিরসনের দাবি জানিয়ে
বলেছেন, আমাদের শিক্ষাজীবন বাঁচান।
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষক সমিতি
ফেডারেশনের সভাপতি ও শ্যামলী আইডিয়াল
পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ এম এ
সাত্তার এ খাতের অবহেলা আর সঙ্কটের কথা
উল্লেখ করে বলেন, যে অবস্থা তাতে এই
শিক্ষায় বেশি মানুষকে আগ্রহী করে তোলা
কঠিন। রীতিমতো অসম্ভব। সম্প্রতি হঠাৎ
শিক্ষার্থীদের সব পরীক্ষার ফি বৃদ্ধির
সমালোচনা করে তিনি বলেন, এখানে পড়ে
সাধারণ পরিবারের সন্তানরা। এখানে
প্রয়োজনে উৎসাহ বাড়াতে হবে। কিন্তু করা হয়
তার উল্টো। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের
বৈষম্যই যেন সঙ্গী। কারিগরি পেশাজীবী হয়েও
অন্য কারিগরি পেশাজীবীদের ন্যায় ডিপ্লোমা
ইঞ্জিনিয়াররা দীর্ঘদিন থেকে স্পেশাল
ইনক্রিমেন্ট থেকে বঞ্চিত। ফলে ন্যায্য
অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে ডিপ্লোমা
ইঞ্জিনিয়ার ও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং
ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি
হয়েছে। এ বিষয়টি বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রীর
কার্যালয় থেকে একাধিক তাগাদা দেয়া সত্ত্বেও
অদৃশ্য শক্তির কারসাজিতে ডিপ্লোমা
ইঞ্জিনিয়ারদের স্পেশাল ইনক্রিমেন্ট প্রদান
করা হচ্ছে না। এদিকে ২০০৮ সালের পূর্ত
মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে
ইঞ্জিনিয়ারের সংজ্ঞায় কেবল গ্র্যাজুয়েট
প্রকৌশলীদের ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে উল্লেখ
করা হয়েছে এবং ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের
বলা হয়েছে সুপারভাইজার। যেখানে
ইঞ্জিনিয়ারের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, কেবল
গ্রাজুয়েট প্রকৌশলীরাই ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে
স্বীকৃতি পাবে। আর ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা
হবে সুপারভাইজার। ফলে জাতীয় ও
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইঞ্জিনিয়ারিং
সার্টিফিকেটপ্রাপ্ত এবং দেশের ইঞ্জিনিয়ারিং
কর্মকা-ের প্রায় ৮০-৯০ ভাগ কাজ সুষ্ঠুভাবে
বাস্তবায়নের দায়িত্বে নিয়োজিত ডিপ্লোমা
ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও হতাশার
সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় ২৭ সেপ্টেম্বর আগের
বিতর্কিত গেজেট বাতিল করে সঙ্কট আর
বৈষম্য নিরসনের উদ্যোগ নেয় সরকার। কিন্তু
বৃহস্পতিবার হঠাৎ ওই দাবি পূরণ করা হলে
সারাদেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে
দেয়ার হুমকি দিয়েছেন বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের
সংগঠন ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন নেতারা।
কোন যুক্তি দাঁড় করাতে না পাড়লেও এক
প্রতিবাদ সমাবেশে তাঁরা দাবি করেন,
প্রকৌশল পেশা ধ্বংসের জন্য নানামুখী
চক্রান্ত চলছে। হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থের জন্য
প্রকৌশলীর সংজ্ঞা পরিবর্তন করা হচ্ছে, এটা
আন্তর্জাতিক স্বীকৃত মানের পরিপন্থী।
আমরা এটা করতে দিতে পারি না। সবার আগে
মেধার মূল্যায়ন করতে হবে। মেধার যোগ্যতায়
যিনি যে পদে যেতে পারেন তিনি সে পদে যাবেন।
এ ক্ষেত্রে কারও কোন আপত্তি থাকবে না।
তাঁদের দাবি, তাঁরা ছাড়া কারও নামের সঙ্গে
ইঞ্জিনিয়ার শব্দ ব্যবহার করার যাবে না।
বলেন, অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় গুটিকয়েক সচিবরা
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের অযৌক্তিক দাবি
পূরণের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। নিয়ম ভঙ্গ
করে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করে
তাঁদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে চান। কর্মসূচী
থেকে ৭ দফা দাবি উপস্থাপন করেন আইইবির
সাধারণ সম্পাদক মিয়া মোঃ কাইউম। এ দাবি
বাস্তবায়ন না হলে তিন সপ্তাহব্যাপী
আন্দোলন কর্মসূচীর ঘোষণা দেন তিনি। তবে
সঙ্গে সঙ্গেই এর প্রতিবাদে সমাবেশ করেছে
পলিটেকনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-
শিক্ষার্থী ও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা।
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের
সাধারণ সম্পাদক শামসুর রহমান হঠাৎ
ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন নেতাদের
তৎপরতার তীব্র সমালোচনা করে বলেন,
ইঞ্জিনিয়ার শব্দ কারও একক গোষ্ঠীর জন্য
পৃথিবীতে কোথাও বরাদ্দ করা হয়নি। বিএসসি
করলে ‘বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার’ আর ডিপ্লোমা
করলে ‘ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার’ পৃথিবীর সব
দেশেই স্বীকৃত। পৃথিবীর কোন দেশে
ডিপ্লোমাধারীদের ‘ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার
বললে অন্যদের মর্যাদা হানি হয় না, কেবল
আমাদের দেশের ওনাদের হয়। দক্ষতা ও
যোগ্যতা নয়, কেবল ডিগ্রীর ওপর ভিত্তি করে
পদোন্নতি দেয়ার দাবির সমালোচনা করে
তিনি বলেন, দক্ষতা ও যোগ্যতা দেখা হবে না
এ ধরনের কথা উদ্ভট চিন্তা ছাড়া কিছু নয়।
পৃথিবীর সব দেশেই সবকিছু দেখেই পদোন্নতি
হয়। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন নেতাদের
অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করে বাংলাদেশ
পলিটেকনিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোঃ
ইদ্রিস আলী বলেন, ওনারা গায়ের জোরে কথা
বলছেন। ওনারাই কেবল মেধাবী বলে প্রচার
চালাচ্ছেন। তাঁরা কেবল বিদ্বেষ ছড়াতেই এসব
করছেন। তিনি বলেন, আমরা তো দাবি করিনি
যে, আমাদের ‘বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার’ বলতে হবে।
আমরা বলেছি আমাদের ‘ডিপ্লোমা
ইঞ্জিনিয়ার’ বলতে হবে। পৃথিবীর সব দেশের
মতো এদেশেও সবাই এটা জানেন। কিন্তু এখন
হঠাৎ ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন নেতাদের
বাধা সঙ্কট তৈরি করার জন্যই। এক প্রশ্নের
জবাবে তিনি বলেন, আমরা দেখব। সরকার
বলেছে ১৫ দিনের মধ্যে সমস্যার সমাধান করবে।
এই সময়টা আমরা অবশ্যই দেখব। তবে
অযৌক্তিক দাবির বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান
থাকবে।

No comments:

Post a Comment